বোকা শৈশব

আমসত্ত্ব কাহিনী
হারুন রশীদ



দেখতে দেখতে ক্লাস থ্রিতে উঠে গেছি তখন। আসলে আরো আগেই উঠে গিয়েছিলাম। যখন টুতে পড়ি তখনো আমার স্কুল ভীতি কাটেনি। মামাতো ভাই বাদলের সাথে ক্লাস টুতে গিয়ে বসে থাকতাম। স্নেহপ্রবণ শিক্ষকেরা কোমলমতি শিশুর এই অক্ষমতা মেনে নিয়েছিল কোন অদ্ভুত কারণে। টু পড়ুয়া ছেলে থ্রিতে বসে বসে কী ঘোড়ার ডিম ভেজেছি এতকাল পর মনেও পড়ে না। কিন্তু যেদিন সত্যি সত্যি থ্রিতে উঠে গেলাম তখনকার একটা ঘটনা এখনো মনে আছে। একটা না, আসলে দুটো ঘটনা। আজকে একটার কথাই বলবো।


থ্রিতে ওঠার পর দুয়েকজন বন্ধুবান্ধব জুটে গিয়েছিল। তাই বাদলের সঙ্গ ছেড়ে তাদের সাথে আসা যাওয়া করি। ক্লাস থ্রিতে বসেই ক্লাস করি। থ্রিতে উঠে হঠাৎ আমার সুনাম বেড়ে গেল একদিন। সেই সময় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে মাত্র দুটো বিষয় পড়ানো হতো। বাংলা এবং অংক। ইংরেজি পড়ানো শুরু হতো ক্লাস থ্রিতে ওঠার পর। কিন্তু বাবা-মা আমাকে ঘরে বসেই ইংরেজি শিক্ষা দিতে শুরু করেছিলেন ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হবার আগ থেকেই। শুধু তাই না আমাকে ইংরেজি টানা হাতের লেখাও শিখিয়ে ফেলেন। ফলে ক্লাস থ্রিতে যখন ইংরেজি পড়ানো শুরু হলো তখন অন্য সব ছাত্রের চেয়ে আমি এগিয়ে ছিলাম। আমার ইংরেজি খাতা দেখে মুগ্ধ হয়ে ক্লাসের শিক্ষক সবাইকে দেখিয়ে বললেন, এই যে দেখো, ওর মতো সুন্দর হাতের লেখা শিখতে চেষ্টা করো সবাই। গর্বে আমার বুকটা তিন ইঞ্চি ফুলে উঠলো। হাত দুটোর পাশে দুটো পাখা গজিয়ে গেল। পায়ের নীচে যেন চাকা জুড়ে গেল। আমি ফুরফুর করে চলতে চলতে বাসায় ফিরে গিয়ে খুশীর খবরটা মাকে দিলাম। বাবা অফিস থেকে ফিরে গর্বিত হয়ে আমাকে তিনটা চকোলেট কিনে দিলেন। আমি ছোট দুই বোনকে না দিয়ে নিজেই খেয়ে ফেললাম সব। কেউ কিছু মনে করলো না তাতে, কারণ আ্মি তখন ভালো ছেলে। নিজে নিজে স্কুলে যেতে পারি। নিজের ক্লাসে বসে ক্লাস করি। 


এত বড় সুনামে একদিন ধ্বস নামলো। কিছুদিন পর মায়ের কাছে স্কুলের জন্য খাতা কিনতে হবে বললে মা আমাকে গোটা একটা পাঁচ টাকা দিয়ে বললেন স্কুলে যাবার সময় দোকান থেকে কিনে নিতে। খাতার দাম ১ টাকা ২৫ পয়সা। মায়ের কাছে ভাঙতি ছিল না। তাই গোটা পাঁচ টাকা দিয়ে বললো ভাঙিয়ে নিতে।  কলোনীর ভেতরেই স্কুল, বাসা, দোকান সবকিছু।


স্কুলে যাবার পথে মসজিদ কলোনীতে খাতার দোকান। জীবনে প্রথমবার দোকানে গিয়ে নিজে নিজে খাতা কিনলাম। খাতা কেনার পর দোকানদার আমাকে ফেরত দিল ৩ টাকা ৭৫ পয়সা। আমি গুনে গুনে ভাঙতি টাকা পয়সাগুলো পকেটে নিলাম।


স্কুলের গেটে পৌঁছে আমার সাথে যে বন্ধু ছিল সে আবদার করলো আমসত্ত্ব খাবে। আমি তখনো জানতাম না কেউ কিছু চাইলে তাকে কিভাবে বারণ করতে হয়। তাছাড়া আমার পকেট ভর্তি টাকাপয়সা। এক পিস আমসত্ত্ব মাত্র ৫ পয়সা। কিনতে কোন সমস্যা নেই।


স্কুলের গেটে বেতের তৈরী ঝুড়ির উপর আমসত্ত্বওয়ালা দাঁড়িয়ে থাকতো। আমি তার কাছে গিয়ে আমসত্ত্ব কিনে দিলাম বন্ধুকে, নিজেও একটা নিলাম। যেই আমরা দুজন আমসত্ত্ব হাতে নিয়েছি অমনি ক্লাসের অন্য বন্ধুরাও ছুটে এলো। আমরাও খাবো, আমাদেরও খাওয়াতে হবে।


আমি হঠাৎ করে উদার হয়ে গেলাম, নাকি উদাস হয়ে গেলাম ঠিক মনে নেই। কিন্তু আমসত্ত্বওয়ালা দুহাতে বিতরণ শুরু করার পর যে দাম আসলো তাতে আমার পকেটের সব টাকা পয়সা শেষ হয়ে গেল সেটা মনে আছে। 


টাকাপয়সা শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে কী সমস্যা হতে পারে তাও তখন বুঝিনি।


ক্লাস শেষ করে যখন বাসায় ফিরলাম তখন মা বললেন, খাতা কিনে বাকী টাকা কী করছো?


আমি নিরীহ কন্ঠে বললাম, "বন্ধুদের আমসত্ত্ব খাইয়েছি।"

মায়ের চোখ কপালে উঠলো, "৩ টাকা ৭৫ পয়সার আমসত্ত্ব কিনে খাওয়াইছো বন্ধুদের!!!"


তখনকার দিনে দশ পয়সা ছিল আমাদের দৈনিক টিফিন খরচ। তাতেই বোঝা যাবে ওই টাকাটার দাম কত। এখনকার তিনশো টাকার বেশী হবার কথা। সুতরাং মা তিন টাকা পঁচাত্তর পয়সার শোকে যে ফিট খাবে সেটাই স্বাভাবিক।


বাবা অফিস থেকে ফিরে এই কথা শুনলে কী হবে সেই চিন্তায় মা আমার পিঠের উপর নগদে যা দিলো, সেটা মনে পড়লে এখন হাসি পায় ঠিকই, তখনকার জন্য মোটেও হাসির ব্যাপার ছিল না।


তবে সেটাই শেষ নয়। আরো বোকামির গল্প তখনো অপেক্ষায় ছিল ভবিষ্যতে। সে গল্প অন্য পর্বে আসবে।


Comments

Popular posts from this blog

তারেক অণু