মৌলী আখন্দের গল্প

 

মিনির মন ভালো নেই






মিনির মন আজকে ভালো নেই। আজকে খুব বকুনি খেয়েছে সে।

ওহ, তোমরা তো জানোই না মিনি কে। মিনি হলো একটা নাদুস নুদুস বিড়ালছানা।

মিনি যাদের বাসায় থাকে, সেই শায়লা আন্টি আর ইমতিয়াজ আংকেল খুবই ভালো মানুষ। ছোট্ট একটা বাবু আছে তাঁদের। নাম সিয়াম।

সিয়াম এখনও নিজে নিজে হাঁটতে পারে না। ওয়াকিং চেয়ারে সারা বাসায় ঘুরে বেড়ায়।

আজকে হয়েছিল কী, শায়লা আন্টি আর ইমতিয়াজ আংকেল একুরিয়াম আর অনেকগুলো লাল সোনালি আর কালো মাছ নিয়ে এসেছেন। মিনি কোনো দিনও এসব মাছ দেখেনি।

একুরিয়ামে যখন মাছগুলো ঢালা হয়েছে, এইসব রঙিন মাছ খেলে বেড়াতে দেখে সে একটু লাফঝাঁপ শুরু করে দিয়েছিল। এক পর্যায়ে একুরিয়াম সই করে একটা লাফ মারতেই একুরিয়ামের ওপরে রাখা শোপিসটা কাত হয়ে গেছে পড়ে।

তখনই শায়লা আন্টি শুরু করলেন বকুনি। “মাছ খাওয়াই না তোমাকে? একুরিয়ামের মাছ দেখে ছোচামি শুরু করে দিয়েছ?”

মিনি বেচারি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। সে বেচারি “মিউ” ছাড়া আর কোনো শব্দ তো করতে পারে না। কেমন করে বোঝাবে খাওয়ার জন্য নয়, স্রেফ অবাক হয়েই মাছগুলো সই করে লাফ দিয়েছিল সে।

অভিমানে মিনি আজকে খায়ওনি। এখন খিদেও লেগেছে জব্বর। কাতর শব্দে মিউ মিউ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে মিনি। শায়লা আন্টি বুঝতে পারলেও বিশেষ পাত্তা দিচ্ছেন না।

সিয়ামের আঙুলের মাথায় কী যেন হয়েছে। গোল গোল লালাভ ক্ষতচিহ্নের মত।

বেচারা কথা বলতে পারে না। মাকে এসে আঙুলের মাথা দেখায়।

শায়লা আন্টি আর ইমতিয়াজ আংকেল সিয়ামকে নিয়ে আজকে ডাক্তারের কাছে যাবেন। আগেই এপয়েন্টমেন্ট নেওয়া ছিল।

যাওয়ার আগে শায়লা আন্টি মিনিকে খেতে দিয়ে গেলেন। সেই সাথে মৃদু বকুনি, “আমি যেন ফিরে এসে না শুনি কোনো রকম দুষ্টুমি করেছ তুমি।“

মিনি বেচারি আর কী বলবে? স্রেফ একটা মিউ শব্দ করে সম্মতি জানিয়ে দিল।

শায়লা আন্টি আর ইমতিয়াজ আংকেল চলে গেলে বাসার কাজে সাহায্যকারী আম্বিয়া আপা টিভি খুলে বসল। সেও বসল তার পাশে।

রাতে খাবার টেবিলে শায়লা আন্টি উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন, “ডাক্তার তো বললেন কিছুতে কামড় দিয়েছে। কী হতে পারে বল তো?”

ইমতিয়াজ চোখের ইশারায় মিনিকে দেখিয়ে দিল। এইসব কুকুর বিড়াল পোষা তার বরাবরই অপছন্দ। এই ছুতোয় যদি বিদায় করা যায়।

শায়লা সবিস্ময়ে বলল, “মিনি? আমার মিনি! যাহ! মিনি কক্ষনো এমন কাজ করতে পারে না।“

ইমতিয়াজ হালকা গলায় বলল, “তাহলে আর কী। খেয়াল রেখো। আম্বিয়া আপাকে বলো খেয়াল রাখতে।“

মিনি কান খাড়া করে শুনল সব। কিছু বুঝল কিছু বুঝল না। ঠিক করল সেও খেয়াল রাখবে সিয়ামকে কিছু কামড় দেয় কিনা।

শায়লা একটা ব্যাংকে চাকরি করেন। আর ইমতিয়াজ ডাক্তার।

সারাদিন আম্বিয়া আপার কাছেই থাকে সিয়াম। দুপুরে সিয়াম ঘুমিয়ে পড়লে আম্বিয়া আপা গোসলে যায়।

মিনি আজকে বসে রইল সিয়ামের ঘরে ওর কটের পায়ের কাছে। হঠাত সে দেখল সিয়াম আঙুল চুলকাচ্ছে ঘুমের ঘোরেই।

মিনির দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। হঠাত সে লক্ষ্য করল সিয়ামের বিছানায় একটা তেলাপোকা। সিয়ামের আঙুলে বসে আছে। ধীরে ধীরে চাটছে আঙুলটা।

মুহূর্তেই মিনি দিল এক লাফ। তেলাপোকাটা চট করে সরে যেতে চাইলেও মিনির ক্ষিপ্রতার কাছে পারল না।

শায়লার আজকে শরীরটা ভালো নেই। মাথাটা ব্যথা করছে। তাই লাঞ্চ ব্রেকেই আর্লি লীভ নিয়ে ফিরে এসেছিলেন।

জানেন এই সময় আম্বিয়া আপা গোসলে থাকে, তাই বাইরে থেকে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন শায়লা। ঢুকে তিনি যে দৃশ্য দেখলেন তার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না।

মিনি বসে আছে সিয়ামের বেবি কটের ওপরে! আর সিয়াম তারস্বরে কাঁদছে।

শায়লা এসে ঢুকতেই সিয়াম তাকে আঙুলটা দেখিয়ে কাঁদতে শুরু করল। শায়লা বললেন, “মিনি! তুমি সিয়ামের আঙুলে কামড় দিয়েছ?”

মিনি মিউ শব্দ করে প্রতিবাদ করল। শায়লা রেগে চিৎকার করলেন, “যাও! বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে!”

মিনি মিউ মিউ করে অনেক কিছু বলার চেষ্টা করল। থাবা বাড়িয়ে দেখাতে চাইল কী যেন।

কিন্তু শায়লা মিনির কোনো কথাই শুনলেন না। মিনিকে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন তিনি। আর মিনি নিজেকে আবিষ্কার করল খোলা আকাশের নিচে।

অভিমানে মিউ মিউ করে কিছুক্ষণ কাঁদল সে। তারপর এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল শক্ত মাটিতেই। কোথায় পাবে ওর জন্য রাখা কার্পেটের নরম বিছানা।

সিয়ামের কান্না থামিয়ে খাওয়া দাওয়া করে সিয়ামকে আর কটে শোয়ালেন না শায়লা। নিজের বিছানাতেই নিয়ে খেলা করতে লাগলেন।

রাতে ইমতিয়াজ ফিরলে সবিস্তারে বললেন মিনির কুকীর্তির কথা। ইমতিয়াজ খুব এক চোট হাসল। বলল, “আমি আগেই বলেছিলাম।“

রাতে সিয়ামকে শোয়ানোর আগে ওর কট ঝাড়তে গিয়ে শায়লা আবিষ্কার করলেন একটা মরা তেলাপোকা। হঠাত তার মনে হলো মিনি কি এটাই দেখাতে চাইছিল তবে?

অনুশোচনায় মনটা ভরে গেল শায়লার। ছুটে এসে ইমতিয়াজকে বললেন, “আমার মিনি কিছু করেনি! সিয়ামকে কামড় দিয়েছিল একটা তেলাপোকা! মিনি শুধু সেটাকেই মারছিল!”

ইমতিয়াজ অবাক হয়ে বলল, “কী করে বুঝলে?”

শায়লা ইমতিয়াজকে মরা তেলাপোকাটা দেখালেন। কেঁদে ফেলে বললেন, “আমার খুব খারাপ লাগছে। না জানি আমার বাচ্চাটা কোথায় না কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।“

ইমতিয়াজ বলল, “আমি এখনই খুঁজে নিয়ে আসছি ওকে।“

মিনি নিচের গ্যারেজেই এক কোণে বসে ছিল অন্ধকারে গুটিশুটি মেরে, বুক ভরা অভিমান নিয়ে। ইমতিয়াজ যখন চিৎকার করে ডাকছিল, “মিনি! মিনি!”

মিনি গুটি গুটি পায়ে সামনে এসে দাঁড়াল। ইমতিয়াজ বলল, “চল! তোমার আন্টি অনেক কাঁদছে তোমার জন্য!”

রাত সাড়ে এগারোটায় মিনি যখন বাড়ি ফিরল শায়লা দুহাত বাড়িয়ে কোলে নিলেন তাকে। আদর করে বললেন, “আমার বাচ্চাটা! রাতে তো খাওয়াও হয়নি না?”

তারপর মিনিকে থালা ভরে মাছ ভাত খাওয়ালেন আদর করে। আর খাওয়া দাওয়া শেষে মিনি ওর কার্পেটের ছোট্ট নরম বিছানায় গোল করে কুণ্ডুলি পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল চুপটি করে দু চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে।

(শেষ)

Comments

Popular posts from this blog

তারেক অণু