লুৎফর রহমান রিটন - ছবির গল্প


নদীর আঁকা ছবি - 'বৃষ্টি'  



ছোট্টবেলায় আঁকার হাতটা খুবই চমৎকার ছিলো নদীর। প্রচুর ছবি আঁকতে চাইতো। ওকে রঙ-তুলি আর কাগজ কিনে দেয়া হতো। নদী আঁকতো। ওর ছবি আঁকার মুড যখনই আসতো তখনই আঁকতে বসতো সে। এর সঙ্গে সকাল বিকেল কিংবা ছুটির দিনের কোনো সম্পর্ক ছিলো না। সপ্তাহে দু'দিন ওকে ওর মা নিয়ে যেতো শিশু একাডেমিতে, গান আর ছবি আঁকার ক্লাশে।


সারাদিন আমি বাইরে বাইরে থাকতাম। নানান ধরণের কাজ আমাকে করতে হতো সংসারের খর্চাপাতি সংগ্রহের জন্যে। সেই কারণে সেই সকালে বেরিয়ে ফিরতে ফিরতে রাত। ফিরে এসে দেখতাম ডায়নিং টেবিলের ওপর নদী ওর আঁকা নতুন ছবিটা রেখে দিয়েছে, আমাকে দেখাবে বলে। ছবির ওপরে দু'তিনটে পেপারওয়েট, যাতে বাতাসে উড়ে না যায় ছবিটা।


খুব আগ্রহ নিয়ে জেগে থাকতো সে। নতুন ছবিটা দেখে বাবাই কি বলে সেটা শোনার জন্যে। সারাদিন নানান হ্যাপা আর ধকল শেষে ক্লান্ত-শ্রান্ত-ধ্বস্ত আমি বাড়ি ফিরে নদীর আঁকা দুর্দান্ত ছবিটা দেখে মুহূর্তেই চাঙ্গা হয়ে উঠতাম। শাদা কার্টিজ পেপারটায় অনিন্দ্যসুন্দর বর্ণিল কিছু মুহূর্তকে ধরে রাখতো নদী। ওর আঁকা ছবিগুলো বরাবরই ছিলো উজ্জ্বল বর্ণাঢ্য।


২.

'এড সাম স্পাইস টু ইয়োর লাইফ'--শিরোনামের একটা পোস্টার দেখেছিলাম। পোস্টারে উজ্জ্বল রঙের কিছু হলুদ-মরিচ-আদা-রসুন আর জিরের পাউডারের মুখ খোলা কৌটো ছিলো। সেই পোস্টারের রঙিন মসলার চাইতে মসলার রঙগুলো আমাকে বেশি আকৃষ্ট করেছিলো। পোস্টারের ভাষাটা আমি মনে মনে শুধরে দিয়েছিলাম। 'স্পাইস'-এর জায়গায় বসিয়ে দিয়েছিলাম 'কালার'--এড সাম কালার টু ইয়োর লাইফ।
যে ছবি আঁকে সে আসলে বাড়তি কিছু রঙ যুক্ত করে তার অবলোকনকৃত পৃথিবীতে। তার পৃথিবীর সমস্ত অবজেক্টকে সে আরও গাঢ় দেখতে পায়। উজ্জ্বল দেখতে পায়।


কেউ একজন ছবি আঁকলেই তাকে পরবর্তীতে শিল্পী হতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নিজের জন্যেও ছবি আঁকা যায়। নিজের জগৎটাকে রাঙিয়ে দিতেই ছবি আঁকে মানুষ।


কৈশোরে আমি যেমন এঁকেছিলাম।
ছোট্টবেলায় নদী যেমন এঁকেছিলো।


প্রতিটা মানুষই আসলে একেকজন শিল্পী। কেউ শিল্পী নিজের জন্যে। কেউ শিল্পী অন্যের জন্যে,পৃথিবীর জন্যে।


৩.

নদীর আঁকা অপূর্ব কিছু ছবি আমি আমার সংগ্রহে রেখেছিলাম খুব যত্ন করে। কিন্তু কোথায় যে হারিয়ে গেলো ছবিগুলো! জীবনের দৌড়ে বাংলাদেশ-জাপান-আমেরিকা-কানাডা করতে করতে ছুটতে ছুটতে কতো কিছু যে হারিয়ে ফেললাম!


সেদিন নদীর আঁকা একটা ছবি পেয়ে গেলাম। ছবির নিচে ডান কোণে নদীর সিগনেচার আর তারিখ অনুযায়ী নদী ছবিটা এঁকেছিলো আজ থেকে একুশ বছর আগে, ১৯৯৯ সালে। ৮.৭.১৯৯৯। আমরা তখন ২৮৩ এলিফ্যান্ট রোডের ভাড়া বাড়িতে থাকি। নদী তখন পঞ্চম শ্রেণি(নাকি ষষ্ঠ?), উদয়ন স্কুল।
 

ছবির বিষয়বস্তু--বৃষ্টি। গ্রামের বৃষ্টি। এই ছবির একটা বিষয় আমাকে অবাক করেছে। সেটা হচ্ছে--ঢাকায় বা শহরে জন্ম নেয়া এবং বিকশিত হওয়া, গ্রাম না দেখা নদী ওরকম একটা গ্রামকে আঁকলো কেমন করে!
আসলে প্রত্যেকটা মানুষেরই নিজের একটা গ্রাম থাকে। নিজের একটা নদী থাকে। সেই গ্রামটাকে সেই নদীটাকে মানুষ নিজের মধ্যে লালন করে আজীবন। নদীর আঁকা গ্রাম আর নদীটা সেই স্বপ্নের গ্রাম আর নদী। এবং সবকিছু ছাপিয়ে ছবির যে বৃষ্টি, সেই বৃষ্টিটাও ওর নিজস্ব বৃষ্টি। এরকম বৃষ্টির ফোঁটা বাংলাদেশে নেই, কানাডায় নেই, নেই ওর টেক্সাস হিউস্টনেও।


এই বৃষ্টিফোঁটাগুলো আসলে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া ছোট ছোট আনন্দের দীর্ঘশ্বাস।


(অটোয়া ১১ অক্টোবর ২০২০)

Comments

Popular posts from this blog

তারেক অণু