মাহবুব আজাদের গল্প
সিন্ধুর আর ইন্দুর
শেরবাহারপুর জঙ্গলে বাঘ একদিন নদীতে পানি গিলতে গিয়ে দেখে, বিরাআআআট উঁচু এক জন্তু পাড়ে দাঁড়িয়ে। তার থামের মতো চারটা পা, কুলোর মতো দুটো কান, মুলোর মতো দুটো দাঁত, আর যেখানে নাক থাকার কথা, তার জায়গায় হাতের মতো এক মস্ত কী-একটা যেন। বাঘকে দেখে জঙ্গলে হরিণ-শম্বর-শূকর-বান্দর সবাই সেলাম ঠোকে, এমনকি জলের মস্ত কুমিরও তাকে সমঝে চলে, কিন্তু এই পেয়ারা গাছের সমান উঁচু জন্তুটার যেন কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। নাকের-জায়গায়-মস্ত-হাতের-মতো ঐ কী-যেনটা দিয়ে সে নদীর জল শুষে টেনে আনমনে নিজের পিঠে ছিটিয়ে চলছে তো চলছেই।
বাঘ ভাবলো, হয়তো জন্তুটা ওকে দেখেইনি। কুঁতকুঁতে চোখ ব্যাটার, কতটুকুই বা দেখতে পায়? বাঘ তাই গলা খাঁকরালো একবার। সে খাঁকরানি শুনে দূরে ঝোপ থেকে পাখি উড়ে গেলো, নদীর উল্টো পাড়ে হরিণের দল তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে শূকরের দলকে ডিঙিয়ে ছুট লাগালো বনের গহীনে, আর গাছে গাছে নানা জাতের বাঁদর কিচমিচ করে উঠলো, একটা পুঁটি মাছও নদী ছেড়ে তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে ফের জলে ডুব দিলো, কিন্তু মস্ত জন্তুটা যেন পাত্তাই দিলো না বাঘকে। একটিবার ঘাড় ঘুরিয়ে কুলোর মতো কানদুটো খানিক নেড়ে সে হেঁকে উঠে বললো, “ভোঁওও? কে রে তুই?”
বাঘ যেন আকাশ থেকে পড়লো ইউরি গাগারিনের মতো। তারই সাধের রাজত্ব শেরবাহারপুর জঙ্গলে কোত্থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে তাকেই কিনা শুধায়, “কে রে তুই?” তার ওপর তুই-তোকারি? ভারি চটে উঠে দাঁত কিড়মিড়িয়ে, গোঁফ ফুলিয়ে, মাটিতে দু’চারবার মস্ত থাবা চাপড়ে বাঘ পাল্টা হেঁকে বললো, “আমি বাঘ! তুই কে?”
জন্তুটা বাঘের বাঘা আওয়াজ শুনে এবার একটু ঘুরে তাকে ভালো করে দেখে নিয়ে বললো, “আমি সিন্ধুর।”
বাঘ এমন নাম কখনও শোনেনি। সে থতমত খেয়ে বললো, “ওহ, তুমি বিদেশি? হুমম। ...তা সিন্ধুর মানে কী?”
সিন্ধুর ফের নাকের-জায়গায়-হাতটা দিয়ে নদীর জল ছানতে ছানতে বললো, “সিন্ধু যার কাছে রম্য, সে-ই সিন্ধুর।”
বাঘ আরও থতমত খেয়ে বললো, “সিন্ধু কী? রম্য কী?”
সিন্ধুর এবার ভারি তাচ্ছিল্য নিয়ে বাঘকে আরেকবার আগাপাশতলা দেখে নিয়ে তার ঝোঝুল নাক উঁচিয়ে বললো, “তুমি তো পুরোই আনপড় মনে হচ্ছে। সিন্ধু মানে নদী। রম্য মানে... যা আনন্দ দেয়। নদী আমাকে আনন্দ দেয়, তাই আমি সিন্ধুর। আদ্যিকালের কবিরা কাব্য করে আমার এই নাম রেখে গেছে।”
বাঘের ইয়াবড় দাঁত আছে, থাবা আছে, সারা গায়ে কিলবিল করছে থোকা থোকা পেশী, লেখাপড়া করে সে সময় নষ্ট করেনি। কিন্তু সিন্ধুরের ওরকম নাক-উঁচু কথা শুনে তার পিত্তি জ্বলে গেলো। সে খ্যাঁক করে উঠে বললো, “বটে? খুব শিক্ষিৎ এসেছিস দেখছি! সিন্ধুর না ছাই! তোকে বাড়ির লোকে কী বলে ডাকে?”
সিন্ধুর এবার পুরোটা ঘুরে এদিক ওদিক মাথা নেড়ে কিছুক্ষণ বাঘকে ভালো মতো মেপে নিয়ে বললো, “হাতি।”
বাঘ বললো, “হাতি? তোর হাত কই যে তুই হাতি? আর নাকের জায়গায় ওটা কী ঝুলছে?”
সিন্ধুর তার নাকের-জায়গায়-ঝোলা অঙ্গটা একবার শূন্যে ঘুরিয়ে বললো, “এটা শুঁড়।”
বাঘ ফের ধমকে শুধাতে যাবে, নাকের জায়গায় শুঁড় কেন, কিন্তু মুখ খোলার আগেই সিন্ধুর তার শুঁড় বাগিয়ে বাঘকে পেঁচিয়ে শূন্যে তুলে নদীর জলে কয়েক দফা চুবিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে বললো, “আবার চেঁচালে একদম পাড়া দিয়ে পেট গেলে দেবো, নচ্ছাড় কোথাকার!”
বাঘ আছাড় খেয়ে একেবারে বোবা বনে গেলো। বনের আর জন্তু তো দূরের কথা, অন্য বাঘও ভুল করে শেরবাহারপুর জঙ্গলে ঢুকে পড়লে তাকে দেখে সটকে পড়ে। আর সিন্ধুর কি না শুঁড়ে ধরে এভাবে পটকান দিলো তাকে? অপমানে, রাগে, অভিমানে, দুঃখে বাঘ পানি না গিলেই চোখ মুছতে মুছতে ফের জঙ্গলে ঢুকে পড়লো। তারপর খালের পাশে একটা হেঁতাল ঝোপের গোড়ায় বসে হু হু করে কেঁদে উঠলো।
বনের আর জন্তুরা এ জীবনে বাঘের কান্না শোনেনি। জন্ম থেকেই তারা বাঘের হাঁকডাক শুনে অভ্যস্ত। নতুন এ শব্দ শুনে সবাই তাই দল বেঁধে দেখতে এলো, ব্যাপারটা কী।
হরিণ দূর থেকে শুধালো, “ওরকম ভ্যা ভ্যা করে কে ডাকে? গাধা নাকি?”
বাঘ চোখ মুছে ধরা গলায় বললো, “আমি বাঘ। কাঁদছি।”
শূকর দু’পা এগিয়ে এসে শুধালো, “কেন গো মহারাজ? কেউ গালি দিলো নাকি?”
বাঘ বললো, “সিন্ধুর আমায় আছাড় দিয়েছে। নচ্ছাড় বলেছে। তুই-তোকারিও করেছে। আমরা কি এই শেরবাহারপুর চেয়েছিলাম?”
বানর গাছের ওপর থেকে বললো, “আমি সব দেখেছি। এখন কি তাহলে সিন্ধুরই বনের রাজা?”
খাল থেকে কুমির নাক বের করে বললো, “বিলকুল। আমার ভোট সিন্ধুরের বাক্সে।”
বাঘ আবার ডুকরে কেঁদে উঠলো। বনের জন্তুরা মাথা নেড়ে ফের বনে চলে গেলো। যে রাজা আছাড় খায়, সে রাজাই নয়। রাজাকে যে তুলে আছড়ায়, সে-ই নতুন রাজা।
কিন্তু নতুন রাজার হালচাল কারো কাছেই সুবিধার ঠেকলো না। যে-ই নদীতে পানি খেতে যায়, তার সাথেই সিন্ধুরের দেখা হয়। সবাইকে সে কঠিন কঠিন পড়া ধরে, পড়া বলতে না পারলে বাঁকা বাঁকা কথা বলে অপমান করে। আর দু’চার কথার পরই সে শুঁড়ে তুলে সবাইকে একবার করে নদীর জলে চুবানি দেয়। কুমির নদীতেই থাকে বলে সিন্ধুর তাকে শুঁড়ে তুলে একবার কাঁটাঝোপে চুবানি দেওয়ার পর কুমির বলা শুরু করলো, “বাঘই ভালো রাজা ছিলো, আমার ভোট বাঘের বাক্সে।”
বনের জন্তুরা একটা সভা ডাকলো। শজারু বললো, “আমার গায়ে কাঁটা আছে, তাই শুঁড়ে তুলে অপমান করেনি। কিন্তু আমার গায়ে কাদা ছিটিয়ে দিয়েছে। আমার মনে হয়, এটা কখনও গণতান্ত্রিক আচরণ হতে পারে না।”
আনপড় বাঘ কলাপাতায় চোখ মুছে বললো, “গণতান্ত্রিক কী?”
শম্বর বললো, “আমিও ঘাসপাতা খাই, সিন্ধুরও ঘাসপাতা খায়। ভেবেছিলাম তার সাথে দোস্তি হবে। কিন্তু ব্যাটার জ্বালায় শান্তিতে দুটো পাতা মুখে দিতে পারি না। আমায় দেখলেই কোত্থেকে এসে দাঁত দিয়ে আমার কাঁকালে গুঁতিয়ে বলে, “লেখাপড়া জানো কিছু? বলো তো, পরিবেশ কয় প্রকার?”
বাঘ শুধালো, “পরিবেশ কী?”
শূকর বললো, “আমি দুই হপ্তা ধরে নদীর ধারে যাই না। কচুঘেঁচু চিবিয়ে তেষ্টা মেটাচ্ছি। আমায় দেখলেই শুঁড়ে জড়িয়ে ধরে বলে, “গলা ছাব্বিশ ইঞ্চি, সিনা ছাব্বিশ ইঞ্চি, আস্তিন ছাব্বিশ ইঞ্চি!” আর কতো অপমান সইবো?”
বাঘ শুধালো, “ইঞ্চি কী?”
বানর বললো, “আমি গাছে থাকি, ভেবেছিলাম আমায় ঘাঁটাবে না। কিন্তু আমি একটু আনমনা হলেই নিচ থেকে শুঁড় দিয়ে লেজ ধরে টানে আর বলে, “বাঁদর বাঁদর বাঁদর, আজ করে দেই আদর, লেজ যদি চাস ফেরত, তবে সেলাম ঠুকে পা ধর।” জান নিয়ে টানাটানি, সে মানতে রাজি আছি, কিন্তু মান নিয়ে টানাটানি কেন?”
বাঘ বললো, “আদর কী?”
এমনি করে সবাই কিছু না কিছু আপত্তি তুললো। মদনটাক পাখি হয়েও রক্ষা পায়নি, সিন্ধুর নাকি তাকে দেখলেই “চান্দিছিলা মদন হো, ভাত খাবি তো বাসন ধো” বলে ডাকে। শেয়ালের ঝোপ্পা ফুলো লেজ দিয়ে নাকি সিন্ধুর প্রায়ই গোসলের পর পা মোছে। ময়াল সাপকে একদিন সে একটা গাছের ডালে এমন জটিল গিঁট মেরে রেখে গেছে, ময়াল এখনও ছুটতে পারেনি।
সবাই যখন শুধু ফোঁসফোঁস কাঁদছে আর বুক চাপড়ে “বাঘই ভালো ছিলো” আর “আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম” বলে শোরগোল করছে, তখন কোত্থেকে নেংটি ইঁদুর এসে বললো, “যদি সিন্ধুরকে খেদাই, আমি কি রাজা হবো?”
কুমির বললো, “অবশ্যই। বাঘকে আছাড় মেরে সিন্ধুর রাজা হয়েছে। তুমি যদি সিন্ধুরকে আছাড় দিতে পারো, তাহলে তুমিই রাজা। আমার ভোট তোমার বাক্সে।”
নেংটি ইঁদুর তৎক্ষণাৎ হরিণের শিঙে চড়ে বললো, “বদ্দা, আমায় সিন্ধুরের কাছে একটু নামিয়ে দে।”
হরিণ এক ছুটে বাতাস ডিঙিয়ে নদীর পারে একটা ঝোপের গোড়ায় নেংটি ইঁদুরকে নামিয়ে দিলো। নেংটি শুধালো, “আশেপাশে প্যাঁচা-চিল-বাজ-কুড়া কিছু নেই তো? সাপ-গিরগিটিরা দূরে দূরে তো?”
হরিণ বললো, “কেউ নেই। শুধু আমি, তুমি, আর সিন্ধুর।”
নেংটি ইঁদুর তখন এক ছুটে সিন্ধুরের একেবারে গোড়ায় গিয়ে নাক উঁচিয়ে লেজ সাপটে বললো, “কী গো, কী করো?”
সিন্ধুর খুব হাত পা নেড়ে সারা গায়ে পানি ছিটিয়ে কাদা লেপ্টে গুনগুন করে ওয়াসিম-অঞ্জুঘোষের প্রাণ সজনী সিনেমার গান গাইছিলো, “কী জাদু করিলা পিরিতি শিখাইলা, থাকিতে পারি না বনেতে প্রাণ সজনী... থাকিতে পারি না বনেতে...”, নেংটি ইঁদুরকে দেখে সে আঁতকে উঠে হাউমাউ করে “ইন্দুর ইন্দুর ইন্দুর... মা গো মাসি গো পিসি গো বাঁচাও বাঁচাও” বলে পায়ে পা জড়িয়ে হোঁচট খেয়ে কাদায় আছড়ে পড়লো, তারপর হাঁচড়েপাঁচড়ে উঠে শুঁড় তুলে কান ঝাপটে নদী পেরিয়ে শেরবাহারপুর জঙ্গল ছেড়ে দিলো সটকান।
নেংটি ইঁদুর নাচতে নাচতে হরিণকে বললো, “তল্লাটের বাঘা বাঘা সব কুঁদুলে মহিলা আমায় ঘরে দেখলে ডরায়, আর এ তো সেদিনের সিন্ধুর। যাকগে, আমিই রাজা এখন। একটা লিফ্ট দাও দেখি ঝটপট। আর এক থালা শুঁটকি মাছ যোগাড় করো। বাতাস করার জন্য সুন্দরী কয়েকটা ইন্দুরী ডাকো। কই রে কে আছিস, বালিশ দে, মালিশ দে... আর এখন আমি রাজা... কাজেই নালিশ থাকলে নালিশ দে।” এই বলে সে নিজেই নিজেকে নিয়ে লেখা গানে সুর জুড়ে দিলো, “বাঘকে ধরে আছাড় মেরে বনের রাজা সিন্ধুর, পেঁদিয়ে তাকে খেদিয়ে দিলো নতুন রাজা ইন্দুর...!”
হরিণ ফিসফিস করে নেংটি ইঁদুরের কানে কানে বললো, “বাঘ কি তোমায় তুলে আছাড় দিতে পারবে?”
নেংটি থতমত খেয়ে বললো, “পারবে তো বটেই।”
হরিণ আরও ফিসফিস করে বললো, “তাহলে সময় থাকতে রাজাগিরি ছেড়ে আমার শিঙে চড়ো। ঐ যে বাঘ এদিক পানেই আসছে।” নেংটিকে শিঙে চড়িয়ে সে বললো, “জনে জনে ধরে আছাড় দিতে না পারলে রাজা হয়ে কাজ নেই।”

Comments
Post a Comment