নাহার তৃণার গল্প

 অ্যান্ড্রোক্লস আর সিংহের গল্প


বহু বহু বছর আগে অর্থ-বিত্তে বলবান মানুষেরা গরীব মানুষদের সাথে ভারী নিষ্ঠুর ব্যবহার করতো। এখন যেমন পশুর হাটে গরু-ছাগল ইত্যাদি বেচা-কেনা হতে দেখো না তোমরা? ঠিক সেভাবে গরীবদের ধরে এনে বিক্রি করা হতো। তাদের দিয়ে অমানুষিক ভাবে খাটিয়ে নেওয়া হতো। এইসব অসহায় মানুষেরা ‘দাস’ হিসেবে পরিচিত ছিল। সেরকম এক দাসের গল্প এটা। সে বহুকাল আগের কথা। রোমে অ্যান্ড্রোক্লস নামে এক গরিব দাস থাকতো। তার মালিক ছিল খুবই নিষ্ঠুর প্রকৃতির। অ্যান্ড্রোক্লসের সাথে মালিকটা একটুও সদয় ব্যবহার করতো না। সে কারণে একদিন সুযোগ বুঝে অ্যান্ড্রোক্লস মালিকের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেল।

পালিয়ে এসে বেশ কিছু দিন অ্যান্ড্রোক্লস হিংস্র পশুতে ভরপুর গভীর এক জঙ্গলে লুকিয়ে থাকলো। কিন্তু সেই বনে খাবার খুঁজে পাওয়া ছিল ভীষণ কষ্টের। দিনের পর দিন, ঠিক মতো খেতে না পেয়ে অ্যান্ড্রোক্লস দুর্বল আর অসুস্হ হয়ে পড়লো। তার মনে ভয় ধরলো এভাবে না খেয়ে থাকতে থাকতে ফট্ করে একদিন সে মরে যাবে। মরণটা যেন শান্তিতেই হয় সেরকম একটা চিন্তাতেই অ্যান্ড্রোক্লস কাছেই এক গুহায় কোনো রকমে হাঁচড়েপাচড়ে ঢুকে নেতিয়ে পড়লো। শরীর দুর্বল থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই সে ঘুমে তলিয়ে গেল।

বেশ কিছুক্ষণ পর বিকট এক আওয়াজে অ্যান্ড্রোক্লসের ঘুম গেল ভেঙে। চোখ মেলে দেখলো, গুহায় দাঁড়িয়ে আছে জলজ্যান্ত এক সিংহ, আর বিকট গর্জনটা তার গলা থেকেই বেরচ্ছে। অ্যান্ড্রোক্লস তো ভয়েই অস্হির! ওর মনে হলো সিংহটা এবার নির্ঘাত তার ঘাড় মটকে গপাস করে খেয়ে ফেলবে। তবে খুব শিগগিরই অ্যান্ড্রোক্লস বুঝতে পারলো সিংহটা রেগে গিয়ে চেঁচাচ্ছে না, তার পায়ে কিছু একটা হয়েছে। যার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে ছটফট করছে। অ্যান্ড্রোক্লস তখন খুব সাহস দেখিয়ে সিংহটা কেন অমন করছে, সেটা পরীক্ষা করে দেখবার জন্যে তার থাবা তুলে দেখলো। অ্যান্ড্রোক্লস যতক্ষণ সিংহের থাবা পরীক্ষা করলো, সিংহটা একদম লক্ষ্মি হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে মাথাটা অ্যান্ড্রোক্লসের কাঁধে ঘষতে থাকলো। যেন বলতে চাইলো,

"ও ভালো মানুষের বাছা, আমি জানি, তুমি আমাকে সাহায্য করবে। যন্ত্রণা থেকে আমাকে মুক্তি দেবে।" সিংহের থাবা মাটি থেকে তুলে বেশ কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে অ্যান্ড্রোক্লস দেখতে পেলো ধারালো একটুকরো পাথর বেচারার থাবায় আটকে আছে। আর সে কারণেই সিংহটা ব্যথায় ছটফট করছে। অ্যান্ড্রোক্লস দু' আঙুলের সাহায্যে পাথরের টুকরোটা ধরে টান মেরে বের করে আনে। পাথরের টুকরোটা বেরিয়ে আসায় সিংহটা খুব আরাম পেলো। কৃতজ্ঞতা আর আনন্দ জানান দিতে সিংহ নতুন পাওয়া বন্ধু অ্যান্ড্রোক্লসের উপর বহুদিনের পোষা কুকুরের মতো ঝাপিয়ে পড়ে জিভ দিয়ে তার হাত আর পা চেটে দিতে থাকে।


দু'জনের মধ্যে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এরপর থেকে সিংহটাকে অ্যান্ড্রোক্লসের একটুও ভয় লাগতো না। সারাদিনের পর রাতে তারা দুই বন্ধু পাশাপাশি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়তো। রোজ সিংহ অ্যান্ড্রোক্লসের জন্য খাবার খুঁজে আনতো। তাদের বন্ধুত্ব দিনে দিনে গভীর হতে থাকে। আগের জীবনের দুঃখ ভুলে অ্যান্ড্রোক্লস প্রিয় বন্ধু সিংহের সাথে আনন্দে দিন কাটাতে লাগলো।

 কিন্তু অ্যান্ড্রোক্লসের কপালটা খারাপ, বেশিদিন বনে থাকার আনন্দ সইলো না। একদিন কিছু সৈন্য জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাবার সময় অ্যান্ড্রোক্লসকে গুহার ভেতর দেখে ফেলে। অ্যান্ড্রোক্লস আসলে কে সেটা বুঝে নিতে সৈন্যদের খুব বেশি সময়ও লাগে না। কাজেই তারা অ্যান্ড্রোক্লসকে রোমে তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেবার জন্য ধরে নিয়ে যায়। সে সময় রোমে অমানবিক একটা নিয়ম চালু ছিল। যদি কোনো দাস তার মালিকের কাছ থেকে পালাতে গিয়ে ধরে পড়ে যায়, তবে তাকে ক্ষুধার্ত সিংহের সাথে লড়াই করতে হতো। এমন লড়াইয়ের জন্য একটা হিংস্র সিংহকে খেতে না দিয়ে বন্দী করে রাখার নিয়ম ছিল। তারপর দিনক্ষণ ঠিক করে ধরা পড়া দাসের সাথে তার লড়াইয়ের আয়োজন করা হতো। 

যখন লড়াইয়ের দিনটা ঘনিয়ে আসতো তখন হাজার হাজার মানুষ সেটা উপভোগের জন্য এসে জুটতো। আজকাল সার্কাস বা ক্রিকেট খেলা দেখতে যেমন মানুষ জমা হয়, ঠিক সেরকম ভাবে সিংহ আর মানুষের লড়াই যেসব জায়গাতে হতো সেখানে প্রচুর লোক গিয়ে জড়ো হতো।

দেখতে, দেখতে সিংহের সাথে অ্যান্ড্রোক্লসের লড়াইয়ের নিদির্ষ্ট দিনটাও চলে এলো। খেলার মাঠের দরজা খুলে সেখানে অ্যান্ড্রোক্লসকে হাজির করা হয়। ভয়ে বেচারা তখন আধমরা। ক্ষিদেতে ছটফট করতে থাকা সিংহের গর্জন শুনতে পায় সে। অ্যান্ড্রোক্লস চারপাশে তাকিয়ে দেখতে পায় হাজার হাজার মানুষ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে তাদের লড়াই দেখার জন্য। মানুষগুলোর চেহারায় দয়া মায়ার ছিঁটেফোটা পর্যন্ত নেই। এরপর ক্ষুধার্ত সিংহটাকে মাঠে নিয়ে আসা হলো। সামনেই শিকার দেখতে পেয়ে এক লাফে সিংহ হতভাগা দাস অ্যান্ড্রোক্লসের সামনে চলে আসে। লড়াই শুরুর মুখে হঠাৎ অ্যান্ড্রোক্লস কান্নায় ভেঙে পড়লো। সে কিন্তু মোটেও ভয়ে কাঁদছিল না। অ্যান্ড্রোক্লস আনন্দে ঝরঝর করে কেঁদে যাচ্ছিল। কারণ লড়াইয়ের জন্য তার সামনে উপস্হিত হওয়া সিংহটা আর কেউ নয়, বনের গুহায় থাকা তার সেই প্রিয় বন্ধু সিংহ।

সিংহের থাবার নীচে পড়ে একটা মানুষের করুণ মৃত্যু দেখবে বলে জড়ো হওয়া হাজারে বিজারে মানুষগুলো তো ওদের ব্যাপার-স্যাপার দেখে অবাক! বিস্মিত হয়ে মানুষেরা অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য দেখতে লাগলো। তারা দেখতে পেলো অ্যান্ড্রোক্লস দু' হাতে সিংহের গলা জড়িয়ে ধরে আছে, আর সিংহটা অ্যান্ড্রোক্লসের পায়ের কাছে শুয়ে পরম মমতায় তার পা চাটছে। আরো দেখতে পেলো ভয়ংকর পশুটা নিজের মাথাটা মানুষটার মুখে ঘষছে আর আহ্লাদে যেন তার কাছ থেকেও আদর চাচ্ছে। একটা রক্তারক্তি লড়াইয়ের বদলে এমন দৃশ্যের কোনো মাথামণ্ডু সমবেত মানুষের মাথায় ঢুকলো না।

কিছু সময় কেটে যাবার পর ব্যাপারটা কী অ্যান্ড্রোক্লসকে সেটা খুলে বলবার জন্য তারা তখন অনুরোধ জানালো। অ্যান্ড্রোক্লস সিংহের গলা জড়িয়ে ধরে উপস্হিত দর্শকের সামনে উঠে দাঁড়ালো। তারপর পালিয়ে গিয়ে গভীর জঙ্গলে সিংহের সাথে গুহায় বাস করা দিনগুলোর পুরো ঘটনা তাদের খুলে বললো।

" আমি একজন মানুষ।" বলে উঠলো অ্যান্ড্রোক্লস। "কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ আমার সাথে বন্ধুর মতো ব্যবহার করেনি। একমাত্র এই সিংহটাই আমার সাথে দয়ালু ব্যবহার করেছে। আমাকে বন্ধু ভেবেছে। আমরা একে অন্যকে ভাইয়ের মতোই ভালোবাসি।" 

একজন অসহায় দাসের প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখাবার মতো অতটা খারাপ ছিল না আসলে লড়াই দেখতে আসা উপস্হিত মানুষগুলো। "ওদের ছেড়ে দাও, নিজের মতো বাঁচতে দাও।" এই বলে তারা তখন চেঁচাতে শুরু করলো। বাকিরাও গলা তুলে বলতে লাগলো, " সিংহটাকেও ছেড়ে দেয়া হোক। ওদের দু'জনকেই স্বাধীনভাবে বাঁচতে দাও।" সবার চাওয়াকে সম্মান জানিয়ে অ্যান্ড্রোক্লসকে মুক্তি দেয়া হলো। সিংহটাকে দেখাশোনার দায়িত্ব অ্যান্ড্রোক্লসই পেলো। এরপর অ্যান্ড্রোক্লস আর সিংহ দুই বন্ধু, বহুবছর একসাথে রোমে শান্তিতে বসবাস করেছিল।

...............................................................................
মূল গল্প: Androclus and the Lion by James Baldwin

Comments

Popular posts from this blog

তারেক অণু