ফারিহা শাহরিনের গল্প
দুটো পাখি
আমাদের বাগানে রোজ পাখি দুটো আসে। উড়ে এসে বসে একটা গাছে। বাগানে এত গাছ আছে, কিন্তু তাদের পছন্দ একটি গাছ। আমি চুপি চুপি প্রতিদিন দেখি। জানালার পর্দা সরিয়ে চুরি করে দেখি। বাগানে গেলে পাখি দুটো উড়ে চলে যায়। পাখিরা মানুষকে বিশ্বাস করে না।
একদিন আমার ইচ্ছে হলো পাখি দুটোকে খাবার দেবো। ওরা কী খায় আমি তো জানি না। বাগানে কত পোকামাকড় আছে সেগুলা খাবে কিনা। খেলেও তাদের তো দিতে পারবো না। আমি পোকামাকড় বড় ভয় করি। যদি কামড়ে দেয়। তাই বুদ্ধি করে একদিন একটা বাটিতে করে মুড়ি দিয়ে আসলাম গাছের নীচে। কিন্তু দেমাগী পাখি ছুঁয়েও দেখলো না। তাকিয়েও দেখে না। পরদিন বিস্কুটের গুড়ো দিলাম। কোন লাভ হয় না। ওরা কী বুঝতে পারছে না? নাকি ভয়ে নামে না।
কয়েকদিন পর গাছের ডালের সাথে একটা প্লাস্টিকের কাপ বেঁধে দিলাম। সেখানে চাল মুড়ি বিস্কুট চিড়া এরকম খাবার সাজিয়ে দিলাম। এবার একটু লাভ হলো। টিটটাট করতে করতে একটা পাখি এগিয়ে গিয়ে ঠোকর দিয়ে কিছু একটা খাবার মুখে নিল। মুড়ি নাকি চিড়া বুঝতে পারলাম না। দেখাদেখি অন্য পাখিটাও গেল। তারা দুজনে খেতে লাগলো এবার। তারপর গল্প করছে দুজনে। টিটি টাটাটিটি টাআ। মনে হয় মজা লেগেছে। কিছুক্ষণ খাবার পর একজন গান ধরলো। টিউউউউ টিউউউউউউ। হঠাৎ মনে হলো আরে পাখিদের তো পানি দেয়া দরকার ছিল। এখন কী করি। পানি দিতে গেলে তো উড়ে চলে যাবে। থাক, পানি আরেকদিন দেবো। গানটান গেয়ে পাখি দুটো চলে গেলে দেখলাম ওরা মুড়িগুলো সব খেয়েছে, কিন্তু চিড়ে খায়নি। বিস্কুট দুই কামড় খেয়েছে। নোনতা বিস্কুট মজা লাগে নাই মনে হয়।
পরদিন আবারো খাবার দিলাম। মুড়ি আর মিষ্টি বিস্কুট। এবার একটা ছোট কাপে পানিও দিলাম বেঁধে। পাখি দুটো উড়ে এসে বসলো। টিট টাট করতে করতে মুড়ি খাচ্ছে। বিস্কুটেও ঠোকর দিচ্ছে। পানি খায় কিনা চোখ রাখছি। একটা পাখি পানি খেল চুমুক দিয়ে। অন্যটা খেল না। সেই পাখিটা মনে হয় পানি পছন্দ করে না। তাহলে কী সে কোক খাবে? আমার বাসার ফ্রিজে বড় একটা কোকের বোতল আছে। কালকে ওদের কোক খেতে দেবো তাহলে। যেই ভাবা সেই কাজ। পরদিন খাবারদাবার দিয়ে আসার পর ফ্রিজ থেকে কাপে করে কোক ঢেলে নিয়ে পানির বাটিতে দিয়ে আসলাম।
পাখি দুটো উড়ে এসে বসলো। আজকে খাবার না খেয়ে টিটিটাটি টিটিটাটা করতে থাকলো দুজনে। কিছুক্ষণ পর একটা পাখি গিয়ে কোকের বাটির কাছে উঁকি দিল। আমি দম বন্ধ করে তাকিয়ে আছি। কোক খেয়ে নিশ্চয়ই গান করা শুরু করবে ওরা। ভাইয়া থাকলে ছবি তুলতে বলতাম। কিন্তু পাখিটা কোকের বাটিতে উঁকি দিলেও কোক খেল না। উড়ে গিয়ে পাশের ডালে বসলো। টিটিটাটি টিটিটাটা করতে করতে দুজনে কী জানি ঝগড়াঝাটি করতে লাগলো। বুঝতে পারলাম না। আজকে খাবারও মুখে নিল না। কিছু সময় পর দুজনে উড়ে চলে গেল। আমার মন খারাপ হয়ে গেল। এত মজার জিনিস ওদের পছন্দ হলো না?
পরদিন থেকে পাখি দুটো বাগানে আসা বন্ধ করে দিল। আমি প্রতিদিন অপেক্ষা করি। কিন্তু এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও পাখি দুটোর দেখা নেই। তাহলে কী কোক দিয়েছি বলে ওরা রাগ করেছে? জানি না। জানলে আমি কখনো পাখিদের কোক খেতে দিতাম না। বাবা বলেন কোক খাওয়া ভালো না। পাখিরাও তাই বলে গেল। এর পর থেকে আমিও আর কোক খাই না। হলুদ পাখি দুটোর জন্য আমার এখনো কষ্ট হয়।


Comments
Post a Comment