পারভীন সুলতানার গল্প

শেওড়া গাছের লাল পেত্নী

            


 

রোজ ভোরে ঘুম ভাঙ্গে আমার। ভোরের মিষ্টি বাতাস জানালা ডিঙ্গিয়ে চোখে-মুখে আদর বুলিয়ে বলে-ওঠো রুদ্র,আর কত ঘুমাবে! বাইরে কী চমৎকার দিন তোমার জন্য অপেক্ষা করছে! আর একটুকও দেরি না করে স্যান্ডেলে পা গলিয়ে বাথরুমে গিয়ে মুখ ধোয়ার সাথে সাথে ঘুমের আলস্যও ধুয়ে ফেলি। তারপর বাইরের বাতাসের সমুদ্রে ঝাঁপ দিই একটা! আমাদের বাসার সামনে রেল-লাইন, সাপের মতো একে-বেঁকে দূর দিগন্তে চলে গেছে। রেললাইন ধরে হাঁটতে শুরু করি।ছন্দোময় তালে কাঠের স্লিপার ডিঙ্গাই। রেললাইনের দুই ধারে কত নাম না জানা ঝোঁপ-ঝাড়  বেগুনি ফুল ভরা বিষ কলমি, আকন্দ ঝোঁপ। এগুলোর গায়ে আবার সই এর মতো জড়াজড়ি করে আছে স্বর্ণলতা। রেললাইনের ঢালে বড়আঁশ শেওড়া গাছে দুনিয়ার পাখি এসে বসে! কত আশা নিয়ে থাকিশেওড়া গাছটায় যদি একটা ভূত দেখা যায়!   

একবার দেখাও গিয়েছিলো। বার্ষিক পরীক্ষার পর আমরা খানিকটা স্বাধীনতা পাই। সন্ধ্যাবেলা উড়ন্ত এক কালো মিশমিশে ভূতকে শেওড়ার পাতা ভরা ডালে বসে পড়তে দেখে আমরা হৈচৈ শুরু করি। বেচারা ভূতটার খুব অসুবিধা হচ্ছিলো বোধহয়। রাত ছিলো ঝকঝকে জোছনাভরা। পরীক্ষার পর কোন কাজ-কাম নাই আমাদের। কথায় আছে নানাই কাজ তো খই ভাজখবরটা বাতাসের সাথে রটে গেলে কেবল ছোটরা না বড়দের কেউ কেউ এসেও জোটে। কেউ লাঠি নিয়ে এলো ভূতটাকে খোঁচাবে বলে। মানুষের যন্ত্রণায় বেচারা ভূতকে স্যারেন্ডার করতেই হয়।ও ওর লম্বা গলা বের করে দিতেই সবাই চিৎকার করে উঠলাম। বেচারা ভূতটা ছিলো লম্বা গলার একটা শকুন। রাণীক্ষেত রোগে পাড়ায় সমানে মোরগ-মুরগি মওে যাচ্ছিলো। শকুনটা এসেছিলো আসলে মরা মুরগি খাওয়ার লোভে। ভূতের বদলে শকুন দেখে পিচ্চিরা এতো মর্মাহত ও হতাশ হয় যেসব ঝাল গিয়ে পড়ে ধরা খাওয়া শকুনের ওপর। রেললাইনের পাথরের ঢিলে ও লাঠির ঘায়ে বেচারা রাণীক্ষেত না হওয়া সত্ত্বেও পটল তোলে। আমার মনে হয় এ পাড়ার  পিচ্চিদের কা--মা- দেখে ভূতেরাও আসতে ভয় পায় এখানে। নইলে কী আর এমন ঝাঁকড়া-ঝোপড়া একটা শেওরা গাছ ভূত শূন্য থাকে!

অন্ধকার ভালো করে কাটেনি এখনও। আমি রেললাইনের উপর বসি। মাত্র একটু আগে ট্রেন গেল। রেললাইন এখনও গরম। একটু একটু কাঁপছেও। রেললাইন ধরে ট্রেন চলে গেলেও বাতাসের খেলা কিন্তু থামেনি। হু হু বাও আমার চুল নিয়ে খেলে, দুষ্টুমি করে। আমারও খুব ভালো লাগে। আমি সার্টের সবকটি বোতাম খুলে দিই। রাতে প্রচন্ড গরম ছিলো। বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে! রেললাইন থেকে নুড়ি কুড়িয়ে একটার পর একটা সাজিয়ে নিজের নাম লিখি-রুদ্র। লেখাটা শেষ হতেই আবার পাথরগুলো এলোমেলো করে ফেলি।তারপর একটা একটা নুড়ি দিয়ে দূরের শেওড়া গাছকে সই করার খেলায় মাতি। ঠিক তিনবারের মাথায় একটা পাথর উড়ে গিয়ে শেওড়া গাছের আগা ছুঁয়ে ফেলে। টকাশ্ শব্দ হয় একটা। ভারি মজা লাগে আমার। খুশিতে দুই হাতে তালি বাজা‌ই। আর এর পরপর ভয়ানক এক কান্ড ঘটে যায়।শেওড়া গাছ থেকে লাল টকটকা শাড়ি পরা পেত্নী নামে একটা। বিশাল লম্বা হাতে ইয়া বড় বড় নখ! বিশাল পায়ের পাতা!ঘোমটা থাকায় মুখ দেখতে পারি না। নিশ্চয় ভয়ঙ্করই হবে! ভূত দেখার সুযোগ পেয়েও থরথর করে কাঁপতে শুরু করি আমি। ভাবি-হায়রে পেত্নীটা এবার নিশ্চয় ঘাড় মটকাবে আমার। বাবা বলেছিলো হাফইয়ারলি পরীক্ষায় ফার্স্ট হলে আমাকে ঢাকা শিশু পার্ক দেখাতে নিয়ে যাবে। গত কাল রেজাল্ট হয়েছে আমি ফার্স্ট হয়েছি ক্লাসে। শিশুপার্কটা বুঝি আর দেখা হলো না আমার! এবার আর রক্ষা নাই! কাঁদো কাঁদো হয়ে এসবই ভাবি। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলি। একটা আঁশটে গন্ধ লাগে নাকে।  শুনেছিলাম ভূত-পেত্নীর গায়ে এরকম গন্ধ থাকে। ঘাড় মটকাবার জন্য তাহলে আমার কাছাকাছি এসে পড়েছে! চোখ না খুলে সাহস করে বলেই ফেলি- পেত্নী মাসিআমি শুধু একবার শিশু পার্কটা ঘুরে আসি পরে না হয় ঘাড়টা মটকিও। পেত্নীটা নাকি স্বরে হেসে ওঠে-হিঁ,হিঁ,হিঁ।তারপর হাসি থামিয়ে বলে- আঁরেঁ গাঁধাঁ চোঁখ খোঁল। তোঁর ঘাঁড় মঁটকাঁবোঁ নাঁ। আঁমিভাঁলোঁ মাঁনুষঁদেরঁ ক্ষঁতি করিঁ নাঁ। সেঁ দিঁনঁ সঁবাঁই মিঁলেঁ শঁকুনঁটা পিঁটিঁয়েঁ পিঁটিঁয়েঁ মেঁরেঁ ফেঁল্লোঁ।দেঁখঁলামঁ তুঁই খুবঁ কষ্টঁ পেঁলিঁ। চোঁখ দিঁয়েঁ পাঁনিওঁ পঁড়ঁছিঁলোঁ তোঁরঁ। লুঁকিয়েঁ লুঁকিঁয়েঁ মুঁছেঁ ফেঁঁল্লিঁ। অবাক হয়ে যাই। পেত্নীরা মানুষের মনের কথাও বুঝে ফেলে! পেত্নীটা এবার বল্লো-শেঁওঁড়া গাঁছ হঁলেঁও এঁখাঁনে বাঁসাঁ কঁরেঁ থাঁকাঁরঁ মঁতোঁ নঁয়।কীঁ দিঁন কীঁ রাঁতঁ ট্রেঁনেঁর শঁব্দেঁ ঘুঁমাঁনোরঁ জোঁ নাঁইঁ। চোখ না খুলে ডর ভেঙ্গে বলেই ফেলি- তাহলে এখানে থাকতে এসেছো কেনপেত্নী আন্টি এবার আদুরে গলায় বলে-এঁবাঁর তুঁইঁ চোঁখ খুঁল নাঁ বাপুঁ! আঁঁমি বেঁশি দিঁনেঁর জঁন্য থাঁকঁতেঁ আঁসিঁনিঁ। আঁমারঁ আঁগের বাঁসাঁর শেঁওড়াঁ গাঁছঁটাঁ কেঁটেঁ ফেঁলেঁছে পাঁজি মাঁনুঁষেরা। আঁচ্ছাঁ মানুঁষঁদেরঁ আরঁ কাঁজঁ নাইঁ খাঁলি গাঁছ-গাঁছাঁলি কাঁটে! এঁরকমঁ চঁলতেঁ থাঁকঁলে তোঁ অক্সিঁজেঁনের অভাঁবেঁ মাঁরাঁ পড়ঁবে মানুষঁ! ঝড়ঁ তুঁফাঁনভূঁমিকঁম্প হঁবেঁ ঘঁন ঘঁন। আমিও বিজ্ঞান বইয়ে এসব পড়েছি। গাছপালা আমাদের পৃথিবীকে মায়ের মতো বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে। বলি-তুমি ঠিক বলেছোবড় মানুষেরা এসব নিয়ে কেন যে ভাবে না! জানোআমি গাছও লাগাই। বৃক্ষরোপন সপ্তাহে বাবাকে বলেছিলাম গাছের চারা আনতে। পেত্নী আন্টি বলে-তুঁই তোঁ খুঁব লঁক্ষীঁ আর ভালো ছেলে! কাঁল গঁরীবঁ কুঁদ্দুঁস মিঞাঁর ছাঁগলঁটাঁকে ট্রেঁনেঁর তঁলে কাঁটাঁ পড়াঁরঁ বিঁপদ থেঁকে বাঁচাঁলি। পাঁথরঁ নাঁ ছুঁড়লেঁ ওটাঁ তোঁ ট্রেঁনলাঁইনঁ থেঁকেঁ দৌঁড়েঁ পাঁলাঁতেঁই পাঁরঁতোঁ না! চঁলঁন্ত ট্রেঁন বড়ঁ দঁয়া-মাঁয়াঁহীঁনঁআঁর ভুঁলেও কঁখঁনঁওঁ ছুঁটন্তঁ রেঁলগাঁড়িঁর ধাঁরেঁ-কাঁছে আসঁবিঁ নাঁ। এরপর অনেক্ষণ কোন সাড়া শব্দ নাই। ভয়ে ভয়ে চোখ খুলি। দেখি রোদ উঠেছে। নিশ্চয় পেত্নী আন্টি চলে গেছে। খুব দায়ে না পড়লে এরা আলোতে আসে না। শেওড়া গাছের দিকে তাকাই। সোনালি রোদের আদরে মাখামাখি হয়ে মিষ্টি হাওয়ার তোড়ে গাছের পাতা আর নরম শাখা এদিক-ওদিক দুলছে।

এর পরদিন ভীষণ এক কান্ড হয় ! সন্ধ্যা রাতে আমদের বাসার সামনের শেওড়া গাছের অন্ধকারে ঘটে ঘটনাটা। ট্রেন ডাকাতি শেষে একদল ডাকাত ড্রাইভারকে ভয় দেখিয়ে গাড়ি স্লো করে পালানোর সময় ধরা পড়ে। ডাকাতগুলো ভয়ে আধমড়া হয়ে বার বার বলতে থাকেএকটা ভীষণ চেহারার লাল পেত্নী নাকি ওদের ঘাড়ে ইয়া বিশাল হাতে থাপ্পর মেরেছে। ওদের চেঁচামেচিতে মানুষজন জড়ো হলে ডাকাতির মাল-সামান সহ ধরা পড়ে।পুলিশ তো বটেই পাড়ার বাচ্চারা পর্যন্ত এমন ডরপুক ডাকাত দেখে হেসে শেষ। শুধু আমি আড়চোখে শেওড়া গাছটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলি অনেক ধন্যবাদ তোমাকে পেত্নী আন্টি!

এর মাস দেড়েক পরের কথা। কড়া রোদের দুপুর! রেললাইন মেরামতের টুকটুক শব্দ হচ্ছে। মাঝে-মধ্যে ট্রেনলাইনের এরকম মেরামতি হয়। স্টেশন মাস্টার এ বিষয়ে অবগত। কোন ট্রেন আসবে না মেরামতি চলার সময়। কাজ চলে টুকুর-টাকুর। কাঠের পুরানো ভাঙ্গা স্লিপার উঠিয়ে রেললাইনের উপর রাখা হয়েছে। ঢিলা স্ক্রু টাইট হয়, পুরানো পাত বদলানো হয়, স্লিপার, পাথর সব কিছুর তদারকি চলে। আমরা কজন ঘুম পালানো ছেলে-মেয়ে মায়েদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মেরামতের কাজ দেখিপুরানো ফেলে দেয়া পেরেক কুড়াই।এর মধ্যে হঠাৎ বলা-কওয়া ছাড়া কু-ঝিক ঝিক শব্দ! সব্বোনাশট্রেন আসে কেন! শ্রমিকরা ভয়ে কাজ ফেলে লাইন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। আমাদেরও দূরে  সরিয়ে দেয় ওরা। রেললাইনের স্লিপার নাইলাইনের জোড়া ও স্ক্রু খোলা। কী হবে! ভয়ে বুক ধড়ফড় করে সবার। মানুষ ভর্তি এগিয়ে আসা ট্রেনের দিকে তাকিয়ে সবাই চিৎকার করি-থামোথামো। কিন্তু চলন্ত ট্রেন থেকে কী বাইরের চিৎকার শোনা যায়! ট্রেন এগিয়েই আসছে! ভয়ে চোখ বন্ধ করি।হঠাৎ ব্রেক করার ঘেষাং শব্দ হয়। ট্রেন ঠিক শেওড়া গাছের কাছাকাছি এসে কোন রকম বিপদ ঘটার আগেই অবিশ্বাস্য যাদুমন্ত্রে থেমে যায়। আতঙ্কিত মানুষ হর্ষোল্লাস করে উঠি।  যাক হোক কোন দুর্ঘটনা ঘটলো না!কী করেড্রাইভারকে ঘিরে ধরে কৌতূহলি মানুষ-ট্রেন থামানো গেলো কী করে! ট্রেন তো হঠাৎ ব্রেক করে থামানো যায় না! রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে ট্রেনচালক জানান -অনেক দূরে থেকেই দেখলাম রেললাইনের উপর লালশাড়িপরা তালগাছের মতো এক মহিলা দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে। ট্রেন থামানোর ইঙ্গিত করা সে হাতে ছিলো  ইয়া বড় বড় নখ! সবাই অবাক হয়ে যায়- ফটফটে দিনের আলো! কই,লালশাড়ির কোন মহিলাতো আমাদের নজরে পড়েনি! যাকড্রাইভার সাব কোন বিপদের আগে ট্রেন থামাতে পারছে যেএটাই বড় কথা। কতোগুলা মানুষ বাঁচলো!

ড্রাইভার চাচার কথা আর কেউ বিশ্বাস না করলেও  আমি করলাম।কৃতজ্ঞতায় আমার ছোট্ট বুকটা ভরে গেলো। কাল ভোরে পেত্নী আন্টিকে ওর ঘোমটা খুলতে অনুরোধ করবো। আমি বুঝতে শিখেছি ভালোজনের যে চেহারাই হোক সেটাই সবচে সুন্দর। এর পর কত কত ভোর চলে গেল। লাল পেত্নী আন্টির সাথে আমার আর দেখা হয়নি।

 

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

তারেক অণু