হুমায়ূন কবীর ঢালী'র গল্প
বন্ধুর ডাক
রাত গভীরে ঘুম থেকে কে যেন ডেকে তুলে মিতুলকে। ডাক শুনে ঘুম থেকে মিতুল জেগে ওঠে ঠিক, তবে ঘরের ভেতর কাউকে দেখতে পায় না। মিতুল ভাবে, হয়ত ডিমলাইট জ্বালানো আছে বলে কাউকে সে দেখতে পাচ্ছে না। খাটের দক্ষিণ কোণায় ঝুলে থাকা বেডসুইচ অন করে সে। আলোয় ভরে ওঠে পুরো ঘর। না, কেউ ঘরে নেই। আলো নিভিয়ে ফের শুয়ে পড়ে মিতুল। কিন্তু বিছানায় শোয়ার সাথে সাথে ফের পরিচিত কণ্ঠ তাকে বলে, ‘মিতুল শুয়ে পড়লি যে?’
হুড়মুড় করে ওঠে বসে মিতুল। বিছানা থেকে নেমে ঘরের মেঝে পা রাখে। ডান পাশের জানালার কাছে যায়। জানালা খোলা। তবে একটা বিড়ালও যাতে ঢুকতে না পারে, সে জন্যে চিকন লোহার জাল দেয়া আছে। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায় মিতুল। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এমন অন্ধকারে কোনোকিছুই দেখার সুযোগ নেই। তবুও সামান্য দূরে কিছু দেখতে চেষ্টা করে। কাউকে দেখতে পায় না। দেখতে না পেয়ে জানালা বন্ধ করে দেয়। ঘুরে বিছানার দিকে মুখ ফেরাতেই আঁতকে ওঠে। বন্ধু সবুজ তার বিছানায় বসে আছে।
‘কিরে তুই?’ মিতুল অবাক হয়।
‘তুই কি ভেবেছিস এই রাত গভীরে জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে তোকে ডাকব?’ সবুজ বিছানায় বসতে বসতে বলে।
‘না-আমি ভাবছি’
‘না-আমি ভাবছি’
‘কি করে ঘরে ঢুকলাম, এইতো?’ মিতুলের কথা বন্ধ করে দিয়ে সবুজ বলে। মিতুল আমতা আমতা করে এগিয়ে এসে সবুজের সামনে চেয়ার টেনে বসে।
বসে ঘরের মূল দরজায় চোখ রাখে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। মিতুলের মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে সবুজ ঢুকল কী করে?
‘শোন, তোর এতকিছু ভাববার দরকার নেই। এছাড়া আমার সময়ও নেই তোকে সব খুলে বলার। ভীষণ তাড়া আছে। তোকে নিয়ে আমাকে এখনই বেরুতে হবে। সজল, রাব্বি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। চটজলদি গায়ে শার্ট জড়িয়ে নে। বেরুতে হবে।’ একদমে কথাগুলো বলে সবুজ। এরপর উঠে দাঁড়ায়। আলনা থেকে একটা শার্ট নিয়ে মিতুলের হাতে তুলে দেয়। মিতুলের শার্ট নিয়ে গায়ে জড়ায়। এরপর সবুজের পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকে মিতুল। সবুজ হাঁটতে হাঁটতে একসময় থামে। মিতুলও থামে। জায়গাটা একটা খোলা মাঠ।
‘শোন, তোর এতকিছু ভাববার দরকার নেই। এছাড়া আমার সময়ও নেই তোকে সব খুলে বলার। ভীষণ তাড়া আছে। তোকে নিয়ে আমাকে এখনই বেরুতে হবে। সজল, রাব্বি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। চটজলদি গায়ে শার্ট জড়িয়ে নে। বেরুতে হবে।’ একদমে কথাগুলো বলে সবুজ। এরপর উঠে দাঁড়ায়। আলনা থেকে একটা শার্ট নিয়ে মিতুলের হাতে তুলে দেয়। মিতুলের শার্ট নিয়ে গায়ে জড়ায়। এরপর সবুজের পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকে মিতুল। সবুজ হাঁটতে হাঁটতে একসময় থামে। মিতুলও থামে। জায়গাটা একটা খোলা মাঠ।
এই মাঠে গতকাল বিকেলে সজল, রাব্বি, সবুজের সঙ্গে বসে আড্ডা দিয়েছে। আড্ডা শেষে সবুজ হুট করেই ঘোষণা দিয়েছে, ‘দোস্ত, তোরা আমাকে ক্ষমা করে দিস। আজ রাতের ট্রেনেই আমাকে বাবা মা’র সাথে ঢাকায় চলে যেতে হচ্ছে।’
‘কেন? হঠাৎ ঢাকা যাবি কেন?’ মিতুল জানতে চায়।
‘কেন? হঠাৎ ঢাকা যাবি কেন?’ মিতুল জানতে চায়।
‘বাবার বদলি। সবকিছু আগেই ঠিকঠাক করা ছিল। তোরা দুঃখ পাবি বলে বলিনি। এছাড়া আমি ভেবেছিলাম বাবা মা’কে বলে বছরের বাকি ছয়মাস এখানেই থেকে যাবো। বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে তারপর যাবো। কিন্তু বাবা মা’কে রাজি করানো গেল না। ফলে তোদের সারপ্রাইজও দেওয়া হলো না। স্যরি ফ্রেন্ডস। তোদের ছেড়ে যেতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্।’
সবুজের এ জাতীয় কথার জন্য প্রস্তুত ছিল না মিতুল, রাব্বি ও সজল। তাই সবুজের বিদায়বেলায় কী বলে সান্ত¡না দেবে কেউ তা খুঁজে পেল না। মিতুল তো একেবারেই মুষড়ে পড়েছে। কারণ, বন্ধুদের মধ্যে সবুজের সাথেই ওর সখ্যতা বেশি। যাহোক, বন্ধুদের সকলের মন খারাপ হয়ে গেল।
সবুজের এ জাতীয় কথার জন্য প্রস্তুত ছিল না মিতুল, রাব্বি ও সজল। তাই সবুজের বিদায়বেলায় কী বলে সান্ত¡না দেবে কেউ তা খুঁজে পেল না। মিতুল তো একেবারেই মুষড়ে পড়েছে। কারণ, বন্ধুদের মধ্যে সবুজের সাথেই ওর সখ্যতা বেশি। যাহোক, বন্ধুদের সকলের মন খারাপ হয়ে গেল।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সজল মুখ খুলে। ‘যা-ই বলিস দোস্ত তুই কাজটা ভালো করিস নি। তবুও তোকে যখন চলেই যেতে হচ্ছে, আমি মনে মনে ঠিক করেছি তোকে তাৎক্ষণিক একটা ফেয়ারওয়েল দেব। কি বলিস মিতুল?’
‘যা খুশি কর, কোনো কিছুই আমার মাথায় আসছে না।’ নরম গলায় মিতুল বলে।
‘যা খুশি কর, কোনো কিছুই আমার মাথায় আসছে না।’ নরম গলায় মিতুল বলে।
সবুজের চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না মিতুলের ভেজাচোখ। সবুজ মিতুলকে বুজে টেনে নিয়ে বলে, ‘দোস্ত আমি জানি তোরা সবাই আমাকে খুব ভালোাবাসিস। আমারও কী কম খারাপ লাগছে? আমি গিয়েই তোদের চিঠি দেব। তোরাও চিঠি দিস।’ ভেজা চোখ মুছে সবুজ।
এ অবস্থায় রাব্বি বলে, ‘সুবজ এক সাথে চলতে গিয়ে অনেক সময় কটু কথা বলেছি। দুষ্টুমি করেছি। এসব মনে রাখিস ন। তুই যত দূরেই যাস, আমাদের মন থেকে তোকে মুছতে পারবো না।’
‘হ্যাঁ, ঢাকা গিয়েই তোর ঠিকানা জানিয়ে চিঠি দিস।’ মিতুল বলে।
‘হ্যাঁ, ঢাকা গিয়েই তোর ঠিকানা জানিয়ে চিঠি দিস।’ মিতুল বলে।
‘অবশ্যই। আজ রাতে আমার সাথে তোরা সবাই ডিনার করবি। আমারদের শেষ আড্ডাটা আনন্দঘন করে রাখতে চাই।’
‘গুড এবং এটাই হবে তোকে দেওয়া আমাদের ফেয়ারওয়েল। কী বলিস মিতুল?’ সজল বলে।
‘গুড এবং এটাই হবে তোকে দেওয়া আমাদের ফেয়ারওয়েল। কী বলিস মিতুল?’ সজল বলে।
‘হ্যাঁ, তাহলে চল বাড়ি ফেরা যাক। দেখি ফেয়ারওয়েলটা কীভাবে স্মরণীয় করে রাখা যায়।’ তারপর সবাই উঠে দাঁড়ায়।
গতরাতে সবুজের বিদায়বেলায় ফেয়ারওয়েল যদ্দুর সম্ভব আনন্দঘন পরিবেশেই করা হয়েছে। সবুজকে সবাই বই উপহার দিয়েছে। সবুজও সবাইকে বই দিয়েছে। সেই বই বুজে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল মিতুল।
গতরাতে সবুজের বিদায়বেলায় ফেয়ারওয়েল যদ্দুর সম্ভব আনন্দঘন পরিবেশেই করা হয়েছে। সবুজকে সবাই বই উপহার দিয়েছে। সবুজও সবাইকে বই দিয়েছে। সেই বই বুজে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল মিতুল।
কিন্তু হুট করে সবুজের উপস্থিতি মিতুলকে অবাক করে দেয়। কেননা, সবুজ রাতের ট্রেনেই বাবা মা’র সাথে ঢাকা চলে গেছে। সজল, রাব্বিসহ সে সবুজকে বিদায় দিয়ে এসেছে। ট্রেন ছেরে দেবার পরও অনেকক্ষণ স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল ওরা। তাহলে সবুজ কি ফিরতি ট্রেনে চলে এসেছে?
মিতুল খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে এসব ভাবতে থাকে। একসময় বলে, ‘কিরে সবুজ, সজল, রাব্বি কোথায়?’
এ কথায় সবুজ অস্বাভাবিক হাসিতে ভেঙে পড়ে। হাসতে হাসতে দূরের অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
মিতুল চিৎকার করে বলে ‘সবুজ, দোস্ত তুই যাসনে। তোকে আমি যেতে দেবনা।’ সবুজকে ধরতে অন্ধকারে ছুটে যায় সামনের দিকে।
এ কথায় সবুজ অস্বাভাবিক হাসিতে ভেঙে পড়ে। হাসতে হাসতে দূরের অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
মিতুল চিৎকার করে বলে ‘সবুজ, দোস্ত তুই যাসনে। তোকে আমি যেতে দেবনা।’ সবুজকে ধরতে অন্ধকারে ছুটে যায় সামনের দিকে।
তখনি মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙে মিতুলের। ‘মিতুল, বাপজান এভাবে চিৎকার করছিস কেন? কোনো স্বপ্ন দেখছিলি?
মিতুল উঠে বসে। এদিক ওদিক কী যেন খুঁজে। খুঁজতে খুঁজতে বলে, ‘মা, সবুজ এসেছিল। ও চলে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ওকে আটকাও মা।’
মিতুল উঠে বসে। এদিক ওদিক কী যেন খুঁজে। খুঁজতে খুঁজতে বলে, ‘মা, সবুজ এসেছিল। ও চলে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ওকে আটকাও মা।’
‘বোকা ছেলে। সবুজ তো রাতের ট্রেনেই ঢাকা চলে গেছে। এখন সবুজকে পাবো কোথায়? বুঝতে পেরেছি তুই স্বপ্ন দেখছিলি। ওকে মন থেকে মুছতে পারছিস না। আল্লার নাম নিয়ে শুয়ে পর লক্ষ্ণী ছেলে।’
মায়ের কথায় মিতুল বিছানায় শুয়ে পড়ে। সে এবার বুঝতে পারে এতক্ষণ সে স্বপ্ন দেখছিল। স্বপ্নের মাঝে সবুজ তাকে নিয়ে খোলা মাঠে গিয়েছিল। সবুজের জন্য মিতুলের মন খারাপ হয়ে যায়। শুয়ে শুয়ে এক এক করে উল্টাতে থাকে বন্ধুকে নিয়ে ঘটে যাওয়া স্মৃতির এ্যালবাম।
ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবে মিতুলের মা ঘরের আলো নিভিয়ে অন্য ঘরে চলে যায়।
Comments
Post a Comment