গল্প
মুক্ত পাখির ঘরে ফেরা
পৃথিকা ইসলাম বৈশালী
রি হলো রাইসার ময়না পাখি।
রি নামটা একটু কেমন না? কিন্তু রাইসা যখন ছোট ছিলো (এখনো সে ছোট, তার বয়স মাত্র নয় বছর) তখন তার বাবা রি-কে নিয়ে এসেছিলো। সবাই তখন ভাবতে লাগলো ময়নার কী নাম দেওয়া যায়? রাইসার সবচেয়ে বেশি উৎসাহ। সে প্রথমে এমন সব উদ্ভট নাম বলছিলো যে সবার মাথা হ্যাং হয়ে যাচ্ছিলো।
এখানে তোমাদের বলে রাখি, নামগুলো বেশিরভাগেরই কোনো মানে ছিলো না। যেমন- প্রথম নামটা সে বলেছিলো ময়দা (একটা ময়নার নাম যে কেন ময়দা দিতে হবে কে জানে!) তোমরা আবার তাকে বলে দিও না যে আমি তোমাদের ফাঁস করে দিয়েছি সে কি নাম বলেছিল! আমাকে যে তাহলে কী করবে!
যাই হোক রাইসা ঘুম থেকে উঠে
বাথরুমে গেল, ব্রাশ করলো, তারপর রি-এর
খাঁচার কাছে গেলো।
“গুড মর্নিং রি” রাইসা বললো।
“গুড মর্নিং” রি বললো।
ও হ্যাঁ! রাইসা রি-কে কথা বলতেও
শিখিয়েছে! রি হলো- যাকে বলে কথা বলা
ময়না পাখি। স্যরি আমি তোমাদের বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।
মুঠি ভর্তি খাবার রি-এর ছোট্ট থালায় দিয়ে খাঁচার দরজা বন্ধ করে রাইসা খাবার ঘরে চলে
গেল।
“মা”
“হ্যাঁ রাইসা”
“আমি কি তোমাকে সাহায্য করতে পারি?”
“সবচেয়ে বড় সাহায্য হয় তুই যদি নাস্তা করতে বসিস!” মা হাসতে হাসতে বললেন।
“আচ্ছা আচ্ছা” রাইসা একটা চেয়ার টেনে সেটাতে বসে পড়লো।
বাবা নাস্তা খাচ্ছিলেন আগে থেকেই।
রাইসা বললো, “বাবা তুমি অফিসে যাবা না?
ইয়াল্লা নয়টা বেজে গেছে!”
বাবা হাসতে হাসতে বললেন, “তুই একটা কাগজে লিখে রাখ যে এখন লকডাউন চলছে স্কুল, অফিস সব ছুটি।"
রাইসা মাথায় চাপড় মেরে বললো, “হায়রে! খালি ভুলে যাই!”
তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো এটা
করোনার কারণে যখন প্রথম লকডাউন শুরু হয় আমি তখনকার কথা বলছি। হ্যাঁ সেটা ছিলো
পাস্ট মানে অতীত এখন প্রেজেন্ট অর্থাৎ বর্তমানে আসা যাক।
একদিন জানের জান বন্ধু টুশির সাথে
রাইসা মায়ের মোবাইল দিয়ে কথা বলছিল।
“পড়া শেষ রাইসা?” টুশি বলে।
“হ্যাঁ। আর অনলাইন ক্লাশ তো নয়টায়ই শেষ হয়ে গিয়েছে।"
“লকডাউন আর ভালোই লাগছে নারে ! কেমন খারাপ
করোনা!”
‘‘লকডাউনের শুরুতে মনে হয়েছিল স্কুল নাই কিছু নাই মজাই হবে। কিন্তু
দ্যাখ এখন এমন ঘরে বসে থাকতে থাকতে বোর হয়ে গেলাম! কী বিরক্তি লাগছে বিশ্বাস করবি না!" রাইসা বললো।
“হ্যাঁ! সত্যি! ” টুশি বলে।
টুশি রাইসার বান্ধবী, যাকে বলে
বেস্ট ফ্রেন্ড। তারা রোজই ফোনে কথা বলে।
“আচ্ছা এখন রাখি। করোনা গেলে দেখা হবে।" বলে রাইসা ফোনটা রাখার আগে
শুনতে পেল টুশি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “ আর করোনা যাবে! আমরা বন্দীই থেকে যাবোরে...”
রাইসার খুব মন খারাপ। তারা কি সত্যিই
বন্দী থেকে যাবে? ইশশ এটা কেমন একটা রোগ! কী খারাপ! খাঁচায় বন্দী পাখিদের কষ্ট যেন
সেও বুঝতে পারছে এখন।
খাঁচায় বন্দী পাখির কথায় রাইসার
মনে পড়লো রি-এর কথা! কতদিন ধরে সে শুধু এক
খাঁচার ভেতরই আছে। নতুন কিছু নেই! চারদিকে খালি লোহার শিক আর ঐ বসার জায়গাটা ছাড়া
কি আর কিছু আছে তার জীবনে? কোনো দিনই কি রি উড়তে পারবেনা খোলা আকাশে?
“না!” বিড়বিড় করে বলে রাইসা। “আমি রি-কে উড়তে বাধা দেবনা। এতোদিন ধরে তার কষ্ট আমি টের পাইনি কেন?”
নিজের উপরই রাগ উঠে যায় রাইসার। নিঃশব্দে রি-এর খাঁচার কাছে চলে যায় সে।
“রি তুমি উড়বে?”
“উড়বে উড়বে!” যে যাইই বলুক রি-এর সেটা নকল করা স্বভাব।
“যাও ওড়ো মুক্ত আকাশে।“ বলে রাইসা খাঁচার দরজা খুলে দিল।
রি একমুহূর্ত দ্বিধা করে আকাশে উড়ে গেল। রাইসা চিৎকার করে বললো, “মুক্ত পাখি সাবধানে থেকো!”
সারাদিন রাইসার রি-এর জন্যে মন খারাপ লাগছিলো। সন্ধ্যায় সে বারান্দায় যায় রি-এর খাঁচাটা দেখতে গিয়ে সে অবাক হয়ে যায়! রি খাঁচার ভিতর চুপচাপ বসে আছে, যাকে বলে, ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রাইসার চোখে পানি চলে আসে! সে খাবারের কৌটা থেকে একমুঠো খাবার রি-এর থালায় দিয়ে দেয়।
রি বলে, “রাইসা রাইসা থ্যাংক ইউ!”
রাইসা বলে, “কেন? উড়তে দেওয়ার জন্য?”
রি কিছু না বুঝে গান গাইতে লাগলো - “আমার মুক্তি আলোয় আলোয়...”
এটা রাইসাই রি-কে শিখিয়েছিলো।
রাইসা ঘরে গিয়ে আকাশ মানে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবে, করোনা গেলে সে কী করবে? বাইরে যাবে অবশ্যই কিন্তু দিন শেষে বাড়ি ঠিকই ফিরবে।
পাখির মতো!

দারুণ হয়েছে গল্পটা!
ReplyDeleteখুবই সুন্দর গল্প,গুছানো লেখা। অনেক শুভকামনা
ReplyDeleteআমার মেয়ে আপনার মন্তব্যে অনুপ্রাণিত হলো খুব। অনেক ধন্যবাদ।
Deleteগল্পটা পড়ে মুগ্ধ হলাম। পাখির মতো করে ভাবতে শিখলে মানুষ কত ভালো করতো। বৈশালীর কাছ থেকে আরো গল্প পড়ার আশা রাখি
ReplyDeleteআমার মেয়ের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
Deleteগল্পটা কি সুন্দর!
ReplyDelete